দিল্লিতে শুরু অনির্দিষ্টকালীন অবস্থান কর্মসূচি
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক জন্তর মন্তর এলাকায় শতাধিক তরুণ-তরুণী অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন। তারা ঘোষণা দিয়েছেন, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে অনেক আন্দোলনকারী রাস্তা ও ফুটপাতে রাত কাটাচ্ছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ সরিয়ে দেওয়ার বিভিন্ন চেষ্টা করা হলেও আন্দোলনকারীরা সেখানেই অবস্থান করছেন।
কীভাবে শুরু হলো ‘ককরোচ’ আন্দোলন?
এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অভিজিৎ দিপকে, যিনি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যে তরুণদের ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
সেই সময় দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছিলেন, “যদি সব ককরোচ একত্রিত হয় তাহলে কী হবে?”— আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)।
অল্প সময়ের মধ্যেই এই আন্দোলন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। দলটির ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়, যা ভারতের শাসক দলের অনুসারীর সংখ্যারও বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে।
প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটে ক্ষুব্ধ তরুণরা
ভারতের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর বয়স ২৫ বছরের নিচে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জাতীয় পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং ফলাফল নিয়ে বিতর্ক তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সচিন কুমার এক বছর কঠোর পরিশ্রমের পর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। পরে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে সেই পরীক্ষা বাতিল করা হয়।
“এটি আমার সব আশা ভেঙে দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা হতাশায় ডুবে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ তাদের কথা শুনছে না।” – সচিন কুমার
যদিও প্রায় ১৭ লাখ শিক্ষার্থী পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেয়, সচিন বিক্ষোভস্থল ছেড়ে যাননি। তার মতে, ভারতের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোর স্বচ্ছতার ওপর আর কোনো বিশ্বাস অবশিষ্ট নেই।
আত্মহত্যার ঘটনা আরও বাড়িয়েছে ক্ষোভ
দুই পরীক্ষার মধ্যবর্তী সময়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এক ডজনের বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনার পর শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
সরকার প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে সাময়িকভাবে টেলিগ্রাম অ্যাপ নিষিদ্ধ করেছে। তবে সমালোচকদের মতে, এটি সমস্যার মূল সমাধান নয় বরং একটি সাময়িক পদক্ষেপ মাত্র।
তরুণদের নতুন রাজনৈতিক জাগরণ
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকেই জীবনের প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনকালই তাদের দেখা একমাত্র রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
রাত গভীর হলেও কেউ গান গাইছেন, কেউ রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছেন, আবার কেউ রাস্তার ওপরেই ঘুমিয়ে পড়ছেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, এটি কেবল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের আন্দোলন নয়; বরং এটি ভারতের তরুণ প্রজন্মের হতাশা ও ক্ষোভের প্রতীক।
অভিজিৎ দিপকের ঘোষণা
“সরকার যদি মনে করে আমাদের ক্লান্ত করে সরিয়ে দিতে পারবে, তাহলে তারা ভুল করছে। আমরা এখানেই থাকব।” – অভিজিৎ দিপকে
তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে আন্দোলনের চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রীকে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হবে।
উপসংহার
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ শুরু হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট থেকে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই এটি ভারতের তরুণদের হতাশা, ক্ষোভ এবং ন্যায়বিচারের দাবির প্রতীকে পরিণত হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি আদায় হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই আন্দোলন ইতোমধ্যেই ভারতের রাজনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
Responses